শবে বরাত

ইবাদাতের অন্যতম রাত শবে বরাত

শবে বরাত

আল্লাহ তা’য়ালা বান্দাদের জন্য দৈনিক, সাপ্তাহিক, বাৎসরিক বহু পূণ্যময় ই’বাদাতের সুযোগ রেখেছেন। সে ধারাবাহিকতায় শা’বান মাসের মধ্য রজনী “শবে বরাত” পূণ্যময় ই’বাদাতের জন্য বিশেষ সুবর্ণ-সুযোগ। বিশ্ব নবী সা. এ রাত্রির মর্ম বুঝে তাকে উদযাপন করেছেন, এবং তার ফযীলত বর্ণনাতে পঞ্চমুখ ছিলেন। স্বর্ণযুগ থেকে সাহাবা-তাবেঈ সহ আক্বাবিরে দ্বীনের মোবারক জামা’ত এ রাত্রিকে ই’বাদাতের মাধ্যমে উদযাপন করে আস্ছে। কিন্তু সম্প্রতিকালে উম্মতকে আমল থেকে অনুযোগকারী ভ্রান্ত দল এই রাত্রির ই’বাদাতের প্রতি সর্বসাধারনের পবিত্র অনুভুতিকে নস্যাৎ করার লক্ষে বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। বলে বেড়াচ্ছে “কুরআন-সুন্নাহে শবে বরাতের কোন অস্থিত্ব নেই। “এ রাত্রির ই’বাদাত বিদআ’ত” মর্মে লিফলেট, হ্যান্ডবিল, পেষ্টুনী সহ বিভিন্ন ভাবে অপপ্রচার করে যাচ্ছে। আর এক ভ্রান্ত দল রেজাখানী ও বেরলভী গোষ্ঠি শরয়ী সীমা অতিক্রম করে এ রাত্রিকে কতগুলি বিদআ’ত-কু-সংস্কার দিয়ে আচ্ছাদিত করে ফেলেছে। মুসলিম উম্মাকে এ দুই সীমালঙ্গনকারী দলের অপতৎপরতা থেকে বাচানোর লক্ষ্যে, তথ্য ও দলীল ভিত্তিক এ সংকলন।  আল্লাহ তা’য়ালা কবুল করুন  আমীন।

 

#শাব্দিক_ও_পারিভাষিক_অর্থে_শবে_বরাতঃ

……………………………………………………………….

★“শব” শব্দটি ফার্সি যার অর্থ, রাত বা রজনী। “বরাত” শব্দটি আরবী থেকে গৃহীত। বাংলায় “বরাত” শব্দটি ‘ভাগ্য’ বা ‘সৌভাগ্য’ অর্থে ব্যবহৃত হলেও আরবীতে, মুক্ত হওয়া, সম্পর্ক ছিন্নতা, বিমুক্তি, নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া ইত্যাদি অর্থে ব্যবহারিত হয়। (দেখুন: আল মু‘জামুল ওয়ফী পৃ.২১২) সে হিসেবে ফার্সী “শবে বরাত” আরবীতে “লাইলাতুল বারাআত” বাংলায় “বিমুক্তির রজনী” বলতে আরবী পঞ্জিকার অষ্টম মাস, শা’বান মাসের মধ্যম রজনী বুঝানো হয়, যাকে হাদীসের পরিভাষায় “লাইলাতুন নিসফি মিন শা’বান” বা “শা’বানের মধ্য রজনী” বলা হয়েছে।

★নামকরণ: যেহেতু বিভিন্ন সহীহ হাদীসে অর্ধ শা’বানের রাতে বান্দার জন্য ব্যাপক মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঘোষণা এসেছে, তাই এ রাতটি আদিকাল থেকেই “শবে বরাত” তথা মুক্তির রজনী নামে প্রসিদ্ধ হয়ে আসছে। ঈমাম ত্বাহ্ত্বাবী রহ. (মৃত.১২৩১হি.) বলেন,سُمِّيَتْ بِذلِكَ لِأَنَّ الله تَعَالى يَكْتُبُ لِكُلِّ مُؤْمِنٍ بَرَاءةً مِنَ النَّارِ এই রাত্রিকে “শবে বরাত” নাম করণ করা হয়েছে। কেননা এ রাতে (গুনাহ মাফের মাধ্যমে) প্রত্যেক মূমিনের জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির ফায়সালা করেন।(হাসিয়াতুত তাহতাবী আলা মারাক্বিল ফালাহ খ.১পৃ.১০৮ প্রকাশ: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা)

 

★একটি শংসয়: তথা-কথিত আহলে হাদীসের কিছু লোকের দাবী হল, ‘শবে বরাত’ শব্দটি কোরআন হাদীসের কোথাও নেই। সুতরাং এটি সম্পুর্ণ বিদআ’ত।

★নিরসন: ‘শবে বরাত’ এটি একটি পারিভাষিক শব্দ, আর একটি স্বতঃসিদ্ধ বিষয় হল, মানুষের পরিভাষা খুবই প্রসস্থ, অর্থাৎ পারিভষিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোন জিনিসের মূল নাম বাদ দিয়ে তাকে অন্য নামেও ডাকা যায়, যতক্ষণ শরয়ী কোন বাধা না থাকে। সুতরাং হাদীসে বর্ণিত “লাইলাতুন নিসফি মিন শা’বান” কে ‘লাইলাতুল বারাআত’ বা ‘শবে বরাত’ করে নামকরণ এরই অন্তর্ভুক্ত। এতে কোন অসুবিধা নেই।

স্বর্ণ যুগ থেকে নিয়ে প্রত্যেক যুগের সালাফদের নিকট শবে বরাতের গুরুত্ব ও তার উদযাপন:

যখন কোন বিশেষ সময়ের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও মাগফেরাতের ঘোষনা হয়। তখন তার অর্থ হল, এই সময় এমন সব নেক আমলের প্রতি যতœবান হওয়া যার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও মাগফেরাতের উপযুক্ত হওয়া যায় এবং ঐ সকল গুনাহ থেকে বিরত থাকা, যার কারণে আল্লাহর রহমত ও মাগফেরাত থেকে বঞ্চিত হয়। তাই আকাবিরেদ্বীন এ রাত্রি ই’বাদাতের মাধ্যমে উদযাপন করেন। যেমন:

১- ঈমাম ইবনে রজব হাম্বলী রহ. লিখেন, সিরিয়ার কতিপয় তাবেয়ী এরাতে বিষেশভাবে ই’বাদাতে মশগুল থাকতেন। এদের মধ্যে ছিলেন, প্রখ্যাত তাবেয়ী আবূ আব্দুল্লাহ মাকহুল (মৃত.১১২ হি.), খালেদ বিন মা’দান (মৃত.১০৩ হি.) ও লোকমান বিন আমের সহ অন্যন্য তাবেয়ীগণ। (দেখুন: লাতায়েফুল মা’আরিফ পৃ.১৩৭)

তিনি আরো বলেন, “কথিত আছে যে তারা কতিপয় ইসরাঈলী বর্ণনার উপর ভিত্তি করে এরূপ আমল করতেন”। তবে কথাটি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এতগুলো রাসূলের হাদীস উপেক্ষা করে অন্য দিকে যাওয়া একজন সাধারণ মুসলমানের জন্যও শোভা পায় না, মাকহুলের মত তাবেয়ী তো দুরের কথা।

তেমনি শামের বিখ্যাত ফক্বীহ ঈমাম আওযায়ী রহ. তিনি দলবদ্ধভাবে নামায দো’য়ার জন্য একত্রিত না হয়ে একাকী নামায দো’য়া করাকে পছন্দ করতেন। (দেখুন: লাতায়েফুল মা’আরিফ পৃ.১৩৭)

২- বর্ণিত আছে যে, ওমর বিন আব্দুল আজিজ রহ.(মৃত.৯৯হি.) বসরায় নিয়োজিত তার একজন গভর্নরের নিকট লিখেন, “চার রাতের প্রতি তুমি যতœবান হও। আল্লাহ তা’আলা ঐ রাতগুলিতে তাঁর রহমত বর্ষণ করেন। রজব মাসের প্রথম রাত। মধ্য শা’বানের রাত। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার রাত। (লাতায়িফুল মাআরিফ পৃ.১৩৭)

৩-ঈমাম শাফেয়ী রহ. (মৃত.২০৪হি.) বলেন. আমাদের নিকট পৌছেছে যে, পাঁচ রাত্রে বিষেশভাবে দো’য়া কবুল হয়, আর তা হল, জুমার রাত্রি, ঈদুর আযহা, ঈদুল ফিতর, রজবের প্রথম রাত ও মধ্য শা’বানের রাত। এই সকল রাত্রির ব্যাপারে যা বর্ণিত হয়েছে তা আমি মুস্থাহাব মনে করি । (কিতাবুল উম খ.১ পৃ.২৬৪ প্রকাশ: দারুল মা’রিফা)

৪- শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রহ.(মৃত.৭২৮হি.) বলেন, শা’বানের রাতের ফযীলতের ব্যাপারে বিভিন্ন মারফূ হাদীস ও আসার বর্ণিত হয়েছে, যদ্দারা বুঝা যায় যে, রাতটি ফযিলতপূর্ণ। আমাদেরও অন্য মাযহাবের অধিকাংশ আহলে ইল্ম এই মত পোষন করেন যে, এই রাতের বিষেশ গুরুত্ব রয়েছে।

(ইক্বতিযাউস সিরাতিল মুসতাক্বিম খ.২ পৃ.১৩৬-১৩৭)

৫- মালেকী মাযহাবের বিখ্যাত ঈমাম ইবনুল আমীর আল্-হাজ্ব রহ. (মৃত.৭৩৭ হি.) বলেন, এ রাত যদিও শবে ক্বদরের রাত নয়, তবুও তার বহু ফযীলত ও কল্যাণ রয়েছে এবং সালাফে সালেহীন এই রাতকে খুবই মুল্যায়ন করতেন। উক্ত রাত আসার পূর্বেই তাঁরা প্রস্তুতি নিতেন। অত:পর তারা উক্ত রাতের সম্মান প্রদর্শণ ও তার সাক্ষাতের আগ্রহী অবস্থায় রাত্রটি তাদের মাঝে উপস্থিত হত। কারণ তারা ইসলামের নিদর্শনাবলীর গুরুত্ব জানতেন। (আল মাদখাল খ.১পৃ.২৯৯দা: তু:)

৬-সহীহ বুখারীর বিখ্যাত ব্যখ্যাকার ঈমাম ইবনু রজব হাম্বলী রহ. (মৃত.৭৯৫হি.) বলেন,“সুতরাং মূমিন ব্যক্তির জন্য উচিত এরাতে তারা আল্লাহর জিকির, বিভিন্ন মুছীবত থেকে রক্ষার্থে দো’য়া ও ক্ষমা প্রার্থনার জন্য (সকল কাজ থেকে) ফারেগ হয়ে যাওয়া। (লাতায়িফুল মাআরিফ পৃ.১৩৭)

৭-ঈমাম সুয়ূতী রহ. (মৃত.৯১১হি.) বলেন, অর্ধ শা’বানের রাত্রির (তথা শবে বরাতের) ফযীলত রয়েছে। আর ই’বাদতের মাধ্যমে রাত্রিযাপন করা মুস্থাহাব। কিন্তু একাকীভাবে জামা’তবদ্বভাবে নয়…।

(আল আমরু বিল ইত্তিবা’ ওয়াননাহয়ু আ’নিল বিদ’আ পৃ.১৩৬ মাত্বাবিউর রসীদ)

৮-বিখ্যাত হানাফী ফক্বীহ আল্লামা শরম্বুলালী রহ. (মৃত.১০৬৯হি.) বলেন, অর্ধ শা’বানের রাতে (ই’বাদত বন্দেগীর মাধ্যমে) জাগ্রত থাকা মুস্থাহাব। (মারাক্বিল ফালাহ্ শরহু নুরিল ঈযাহ পৃ.১৫১ মাকতাবাতুল আসরিয়্যাহ)

৯-আল্লামা আব্দুল হাই লখনবী রহ. (মৃত.১৩০৪হি.) বলেন, শবে বরাতে যে কোন ধরনের ই’বাদাাত ও নফল আদায়ের মাধ্যমে রাত্রি জাগরন করা মুস্থাহাব হওয়ার ব্যাপারে কারো মতপার্থক্য নেই। অত:পর তিনি বিভিন্ন হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, রাসূলের বাণী ও কর্ম বিষয়ক হাদীসের সমষ্টি দ্বারা জানা যায় যে, উক্ত রাত্রে অধিক পরিমানে ই’বাদত করা মুস্থাহাব। নামায ও অন্যান্য ই’বাদাতের ব্যাপারে ব্যক্তি ইচ্ছাধিন থাকবে। সুতরাং কেউ যদি নামাযের ইচ্ছা পোষণ করে, তো কত রাকা’ত পড়বে সেটি তার উপরই সোপর্দ করা হবে। যতক্ষণ শরীয়ত প্রণেতার পক্ষ থেকে সরাসরি বা ইঙ্গিত পূর্বক কোন বাধা না থাকে। (আল আসারুল মারফুআ’ খ.১ পৃ.৮১)

১০-তিরমিযী শরীফের ব্যাখ্যাকার আব্দুর রহমান মোবারকপুরী রহ. (মৃত.১৩৫৩হি.) বলেন,“জেনে রাখুন, অর্ধ শা’বানের রাতের ব্যাপারে (শবে বরাতের) কিছুসংখ্যক হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যার সমষ্টি একথার উপর বুঝায় যে, এরাতের ফযিলতের ভিত্তি আছ্”ে। অত:পর তিনি এসম্পর্কে বর্ণিত হাদীস সমূহ উল্লেখ্য করে বলেন, এসব হাদীস ঐ সকল লোকদের বিপরিত দলীল যারা ধারনা করে যে, অর্ধ শা’বানের রাতের ফযীলতের ব্যাপারে কোন কিছু সাব্যস্থ নেই। (তুহফাতুল আহওয়াযী খ.৩ পৃ.১৬২)

১১-আরবের বিখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খ আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ আল গুমারী রহ. শবে বরাতের ফযীলতের ব্যাপারে বর্ণিত হাদীস ও আসারসমূহ উল্লেখ করে বলেন, এ সকল হাদীস ও আসার থেকে বুঝা যায় যে, এ রাত্রে নামায পড়া এবং দোয়া, জিকির ও তিলাওয়াত ইত্যাদির মাধ্যমে কাটানো মুস্থাহাব। (“হুসনুল বয়ান” শায়খ আব্দুল হাফীজ মক্বী র. কৃত “ফাযায়িলু লাইলাতিন নিসফি মিন শা’বান” থেকে সংগৃহীত পৃ.২৬)

উপরোক্ত হাদীসসমূহ এবং আকাবিরেদ্বীনের মন্তব্য ও কর্মের দ্বারা মধ্য শা’বান তথা শবে বরাতের বিশেষ ফজীলত সুস্পষ্ট। এ রাতে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের ধার ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত হয়। বান্দার দো’য়া আল্লাহপাক কবূল করেন। কিন্তু কয়েক শ্রেণীর ব্যক্তির দোয়া আল্লাহপাক কবূল করবেন না। নিম্নে তা উল্লেখ করা হল,

১. মুশরিক তথা শিরিককারী। (ছহীহ ইবনে হিবক্ষান -হাদীস নং ৫৬৩৬)

২. মাতা-পিতার অবাধ্য ব্যক্তি। (শুয়াবুল ঈমান বায়হাক্বী- হাদীস নং ৩৮৩৭)

৩. যিনা কারী। ( প্রাগুক্ত)

৪. খুনী। (মুসনাদে আহমদ হাদীস নং ৬৬৪২)

৫. নিত্য মদ্য পানকারী। (প্রাগুক্ত)

৬. আতœীয়তা বিচ্ছিন্নকারী। (প্রাগুক্ত)

৭. চুল গিরার নিচে কাপড় পরিধানকারী। (প্রাগুক্ত)

৮. হিংসুক ব্যক্তি। (তাব্রানী কবীর- হাদীস নং ১৬৬৩৯)

৯. দিলে শত্র“তা লালনকারী ব্যক্তি। (বায়হাক্বী সুনানে কুব্রা- হাদীস নং ৩৮২৭)

১০. জাদুকর ব্যক্তি। (লতাইফুল মা’আরিফ পৃ: ১৩৭)

১১. অবৈধ কর আদায়কারী। (প্রাগুক্ত)

১২. জ্যোতিষী। (প্রাগুক্ত)

১৩. গণক। (প্রাগুক্ত)

১৪. ঢোল ও বাদ্য ওয়ালা। (প্রাগুক্ত)

১৫. অবৈধ কবিতা রচনাকারী। (প্রাগুক্ত)

১৬. অবৈধভাবে জমি উৎপাদনের এক দশামাংশ আদায়কারী। (প্রাগুক্ত)

১৭. হারাম বক্ষণকারী। (তাবরানী আওসাদ- হাদীস নং ৬৪৯৫)

শবে বরাতে করণীয় কাজসমূহ:

১-নফল নামায আদায় করা। তবে তার জন্য সংখ্যা নির্ধারণ নেই।

২-কোরআন তিলাওয়াত করা। যিকির-আযকার, তাসবীহ-তাহলীল পড়া এবং রাসূল সা. এর উপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ করা ইত্যাদি।

৩-জরুরী মনে না করে দলবদ্ধ না হয়ে সম্ভব হলে কবর যিয়ারত করা। যা পূর্বে উল্লেখিত ৯নং হাদীস দ্বারা বুঝা যায়।

৪-নিজের জন্য ও সকল মুসলিম নর-নারীর জন্য দোয়া করা।

৫-খালেস দিলে তাওবা ইস্থিগফার করা।

৬-অন্য যে কোন বৈধ ই’বাদাত করা।

শবে বরাতের বর্জণীয় কাজসমূহ:

বর্তমানে শবে বরাতের ব্যাপারে কিছু মানুষ যেমন ছাড়াছাড়িতে লিপ্ত, তেমনি এক শ্রেণীর লোক আছে যারা অতিরঞ্জিত ও বাড়াবাড়িতে লিপ্ত। তারা এ রাত উপলক্ষে নানা অনুচিত কার্জকলাপ ও রসম-রেওয়াজ পালন করে থাকে। কোরআন-হাদীসে যার মযবুত কোন ভিত্তি নেই বরং এসব সম্পুর্ণ মনগড়া শরীয়ত বিরোধী প্রথা। নিম্নে তার কিছু উল্লেখ করা হল,

১-শবে বরাতের নফল ই’বাদাতের জন্য দলে দলে মসজিদে সমবেত হওয়া। (ইক্বতিযাউস সিরাতিল মুসতাক্বিম খ.২ পৃ.১৩৭, মারাক্বিল ফালাহ পৃ.১৫১) তবে কোন ধরনের ডাকাডাকি ব্যতীত অনেক লোক এসে গেলে সবাই নিজ নিজ ই’বাদাাত করবে এতে কোন অসুবিধা নেই।

২- শবে বরাতের নামায, নির্দিষ্ট নিয়মে পড়া। যেমন, ১২ রাকা’ত নামায পড়া ও তার প্রত্যেক রাকাতে ৩০ বার সূরা ইখলাস পাঠ করা ইত্যাদি। এ ধরনের নির্দিষ্ট আমলের কথা গ্রহণযোগ্য কোন হাদীসে নেই। বরং মুহাদ্দিসগণ এ ধরনের বহু হাদীসকে জাল ও বানোওয়াট আখ্যা দিয়েছেন।

(দেখুন:মাওযুআতে ইবনুল জাওযী খ.২পৃ.৫২, আল-লাআলী খ.২পৃ.৫৯-৬০, আল-মানারুল মুনীফ পৃ.৮৯-৯৯, আল-আসরারুল মারফুঅ’আহ্ পৃ.৩৩০)

৩-শবে বরাত উপলক্ষে খিছুড়ি বা হালুয়া-রুটির ব্যবস্থা করা।

(ইক্বতিযাউস সিরাতিল মুসতাক্বিম খ.২ পৃ.১৩৭,)

৪-মসজিদ, ঘর বাড়ি বা দোকনে আলোকসজ্জা করা।

(ইক্বতিযাউস সিরাতিল মুসতাক্বিম খ.২ পৃ.১৩৭,)

৫- শবেবরাত উপলক্ষে গোসল করাকে সুন্নাত-মুস্থাহাব বা বাধ্যতামূলক মনে করা। তবে যদি কেউ রাত্রি জাগরনের জন্য শরিরকে প্রফুল্ল রাখতে গোসল করে এতে কোন সমস্যা নেই। ফুক্বাহাগণ এর অনুমতি দিয়েছেন। (দেখুন: মারাক্বিল ফালাহ পৃ.৪৮ মাকতাবাতুল আসরিয়া, রদ্দুল মুহতার খ.১পৃ. ১৭০ দারুল কুতুব)

৬- আতশবাজি, তারাবাতি, মরিচ বাতি,ও পটকা ইত্যাদি ফাটানো।

৭- খতমে সবিনার আয়োজন করা।

৮- মীলাদ মাহফিলের আয়োজন করা।

৯–দলবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন মসজিদে এবং মাজারে ভ্রমন করা।

১০- মাযার ও কবরস্থানে মেলা বসানো এবং সেথায় ভিড় জমানো।

১১- জামা’তের সাথে নফল আদায় করা।

১২- শবে বরাত উপলক্ষে দলবদ্ধ হয়ে জিকির করা। (তবে কারো পূর্ব

থেকে জিকিরের অভ্যাস থাকলে সেটা ভিন্ন কথা)

উল্লেখিত কাজসমূহ কোরআন-হাদীস সমর্থিত নয় এবং সালাফে সালেহীনদের থেকেও গ্রহণযোগ্য মতানুসারে এর কোন নযীর পাওয়া যায়না। তাই এ সকল কাজ অবশ্যই পরিহারযোগ্য।

কথিত ভ্রান্ত দলের ভাইদের প্রতি আমাদের অনূরোধ

উল্লিখিত সংক্ষিপ্ত আলোচনা-পর্যালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে স্পষ্ট হল যে, “শবে বরাত” একটি ফযীলতপূর্ণ রজনী। একে ই’বাদতের মাধ্যমে উৎযাপন করা কুরআন-সুন্নাহ ও আকাবিরে উম্মতের ধরাবাহিক আমল দ্বারা সাব্যস্থ। তাই তো আল্লাহ তা’আলার নেক বান্দারা সে রজনীতে ই’বাদতে মশগুল থাকেন । অত:এব দু’একজন বিচ্ছিন্ন মতপোষনকারী আলেমের অনুসরণ করত: নেক বান্দাদেরকে খোদার ই’বাদত থেকে বঞ্চিত করার প্রোপাগান্ডা চালাবেন না। সম্ভব হলে কোন বে-নামাযী ব্যক্তিকে নামাযী বানাতে পারেন কি না দেখেন! কালজয়ী সাধক, ওলিকুলের শিরমণী, আল্লামা শেখ ফরীদুদ্দীন আত্ত্বার রহ. এর ভাষায় বলব,

قوت نیکی نداری بد مکن ۞ بر وجود خود ستم بےحد مکن

অর্থ: ভাল কাজ করার ক্ষমতা না থাকলে মন্দ করিও না। ( কেননা তা নিজের উপর জুলুম) অতএব নিজের অস্থিত্ত্বের উপর জুলুম করিও না।

সার্বিক তত্তাবধান -উচ্চতর হাদীস গবেষণা বিভাগ, জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর (আরবি বিশ্ববিদ্যালয়) চট্টগ্রাম।

“মাহমুদুল হাসান রাহাত”

শবে বরাতের ফজীলত read more

Default image
Saiful Islam
Articles: 14

Leave a Reply