tal gacher vhut

তাল গাছের ভূত

ভুতের গল্প বা কাহিনি তো মানুষ ইউটিউবে অনেক শুনে থাকে কিন্তু লেখা কাও পরে না । চলুন ভুত নিয়ে একটি সত্য ঘটনা শুনে আসি। তো চলুন শুরু করি ।

সেদিন সন্ধ্যাবেলা , আমাদের বাসার উঠানে চাটাই বিছিয়ে আমি ,আমার বোন আর আমার বাবা বসে গল্প করছিলাম । আর সেইসাথে চা-নাস্তা খাচ্ছিলাম । তখন ছিল চৈত্র মাস , সারা দিন সুর্যের প্রচণ্ড তাপের পর এই সন্ধ্যা বেলা বেশ জোরে হাওয়া বইছে । আর এই পরিবেশে বসে গল্প করতে আমাদের খুব ভাল লাগছিল। বাবা বাবা অনেকদিন তো কোন ভূতের গল্প শুনি নি আজকে একটা ভূতের গল্প শোনাও না । ভূতের গল্প এই স্নধাবেলা শুনবি , রাতে তুই আর তোর ছোটবোন ভয় পাবি যে। না বাবা আজকে তোমাকে একটা ভূতের গল্প বলতেই হবে । অনেক জোরাজুরি করার পর বাবা ভূতের গল্প বলতে রাজি হলেন ।  অথচ ঠিক আছে আজকে তোদের আমার জীবনে ঘটে যাওয়া একটি সত্যিকারের ভূতের ঘটনা শোনাবো ।

আমি আমার জীবনে একবারই ভূত দেখেছিলাম কি ভয়ানক ছিল সেই ঘটনাটি । থাকুরের কৃপায় আমি সেদিন বেঁচে গিয়েছিলাম । সালটা ছিল ১৯৯৮ তখন তোদের জন্ম হয়নি আমার বয়স তখন প্রায়ই ২৬/২৭  বছরের মতো । আমি গ্রামের বাজারে নতুন দোকান দিয়েছিলাম মাত্র। দোকানটি ছিল বাজারের নির সিংহ মন্দিরের খুব কাছেই । আমি প্রতিদিন বেচাকিনা শেষ করে রাত প্রায় ৯  টা থেকে সাড়ে  ৯  টার মধ্যেই দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরতাম । তবে কোনো কোনো দিন কাজের চাপ বেশী থাকলে বা বেচাকেনা বেশি হলে বাড়ি ফিরতে রাত ১০ টা থেকে ১১ টার মত বেজে যেত । তো দোকান খোলার পর প্রায় দুই বছর কেটে গেল ।

বাজারের আমার পরিচিতি ও ব্যবসা ক্রমশ বাড়তে লাগল । এই ভাবেই আমার দিনকাল ভালই কাটছিল সে দিন ছিল শনিবার কাজের চাপ অনেক বেশি থাকায় দোকান বন্ধ করতে প্রায় রাত ১১  টার মত বেজে গিয়েছিলো । আমি দ্রুততার সাথে দোকান বন্ধ করে নিজ বাড়ির রাস্তার দিকে রওনা দিলাম । আমার হাত ছিল একটা খরচের ব্যাগ ও টর্চলাইট । কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমি মন্দির পার হয়ে বাজারের একেবারে মাঝখানে চলে এলাম । তখন বাজারের অবস্থা খুব বেশি উন্নত ছিল না । বাজারের মাঝখানের রাস্তা দিয়ে হেটে চলেছি । রাস্তার দুই পাশের প্রায় সকল দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে দুই একজন মানুষের চলাচল লক্ষ্য করা যাচ্ছে । আমি আর আশেপাশে খেয়াল না করে এক মনে হাটতে থাকলাম । কিছুক্ষণ হাঁটার পর লক্ষ্য করলাম রাস্তা প্রায় শূন্য এতক্ষণ বাজারের মাজেজা দু একজন লোক ছিল এখন কোন মানুষের চিহ্ন নেই এই রাস্তায় ।

নির্জন এই রাস্তাটি দুদিক থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক । কখনো কখনো খুব কাছ থেকে শেয়ালের ডাকও শোনা যাচ্ছে ।  তখনো কিন্তু আমি রাস্তা দিয়ে একাই হেঁটে যাচ্ছি কিছুক্ষণ পর আমার কেমন জানি মনের মধ্যে ভয় করতে লাগল । আচমকা শরিরটা ধীরে ধীরে পাহাড় হতে লাগল মনে মনে ভাবলাম অন্য দিন তো ফেরার সময় এমন হয় না ।

হঠাত আমার মনে হলো কে যেন আমাকে অনুসরণ করে আমার পিছন পিছন আসছে এবং তার হাটার আওয়াজ আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম । কোন কিছু না ভেবে আমি পিছনের দিকে তাকালাম দেখলাম আমার একটু দূরেই সাদা কাপড় পরা এক বৃদ্ধা মহিলা দাঁড়িয়ে আছে । মহিলাটির মাথায় বড় একটা ঘোমটা ছিল , বৃদ্ধটিকে দেখে আমি কিছুটা অবাক হয়ে গেলাম । বৃদ্ধটি এত রাতে এখানে কি করছে মনে মনে ভাবলাম বৃদ্ধটির কাছে যেয়ে জিজ্ঞাসা করলেই তো সবকিছু জানা সম্ভব । বৃদ্ধির দিকে কিছুটা এগিয়ে যেতেই লক্ষ্য করলাম সেই কেমন একটা আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।  এবং ঐ বৃদ্ধার চেহারা দেখে কোন স্বাভাবিক মানুষের চেহারার মত মনে হলো না ।

আমার মনের ভাবটা যেন আরও বেড়ে যেতে লাগল । সেই সাথে মনের ভেতর থেকে কে যেন আমাকে ওই বৃদ্ধাদের কাছে যেতে বারণ করছে । তাই আমি আর নাই গিয়ে পিছন ফিরে সোজা নিজ বাড়ির রাস্তার দিকে হাটা শুরু করলাম । কিছুটা পথ অতিক্রম করতেই একটা জিনিস লক্ষ্য করে অবাক হয়ে গেলাম । পিছন থেকে আগের মত সেই হাটার শব্দ আর পারছিনা । আমি কিছুটা বউয়ের সাথে পিছন ফিরলাম রাস্তায় একেবারে জনমানবহীন । কি হলো ব্যাপারটা বৃদ্ধটি কোথায় গেল , বৃদ্ধার এই হঠাৎ অদৃশ্য হওয়ার ব্যাপারটা আমার মনের ভয় কে যেন আরো বাড়িয়ে দিল । কারণ রাস্তাটি একেবারে সোজা এবং এর আশেপাশে কোন সংযোগ রাস্তা ও নেই । ওই পথ দিয়ে বৃদ্ধটি তার গন্তব্যে পৌঁছাবে রাস্তার দু’পাশে শুধু ধান ক্ষেত আর ধানক্ষেত ।

আমি তখন নিজের মনকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম বৃদ্ধটি কোন ধান ক্ষেতের আলপথ ধরে বাড়ির দিকে যাচ্ছে হয়ত । হাতে থাকা টর্চটি উঠিয়ে ধানক্ষেত লক্ষ্য করে ধরলাম , কিন্তু কোথায় সেই বৃদ্ধাটি । এই নির্জন রাস্তায় কেবল আমি একা নিজেকে খুব অসহায় মনে হতে লাগল । এবার আমি ঠিক করেছি আর যত কিছুই হোক না কেন আমি আমার নিজ বাসায় যেয়েই দম নিবো । এবং আমি খুব দ্রুত হাঁটা শুরু করি । কিন্তু একই রাস্তা যেন শেষ হচ্ছে না , হঠাৎ সামনের দিকে কিছুটা দূরে টর্চের আলো পরতেই আমি হকচকিয়ে গেলাম । আরে এ তো সেই বৃদ্ধা টি যাকে কিছুক্ষণ আগে আমার পিছনে হেঁটে আসতে দেখেছিলাম । এবার আমি ওই বৃদ্ধটির পিছু পিছু হাটতে থাকলাম । কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ চোখের পলকে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল বৃদ্ধার টি তখন আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে এই বৃদ্ধা টি বাস্তবে কি ।

গ্রামের অনেকের মুখেই শুনেছি সাদা কাপড় পরা এক দুষ্ট আত্মার কথা । বৃদ্ধটি অদৃশ্য হওয়ার পর আমি আরো দ্রুত হাঁটা শুরু করলাম । আমাদের বাড়ি ফেরার সোজা রাস্তার দুই ধারে কিছু তাল গাছ ছিল । হাঁটতে হাঁটতে যখন সেই তালগাছ গুলির কাছাকাছি এলাম হঠাৎ আমার দৃষ্টি গেল ওই তালগাছ গুলির দিকে । দেখি দুটি তাল গাছের মাথা একসাথে নিচু হয়ে গেছে আর তার উপর বসে আছে সেই বৃদ্ধাটি । আর মাথার সাদা চুলগুলি যেন সাপের মত নড়া চড়া করছে । আর সে এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ।  এই দৃশ্য দেখে আমার পেটের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল ।

ভয়ে আমার হাত পা কাঁপতে লাগল , তখন ওই দুষ্টু আত্মাটি আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল । মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম জীবনের সবচেয়ে বড় দৌড়টাই এখন দিতে হবে । দৌড়াতে যে লক্ষ্য করলাম দৌড় তো দূরের কথা আমি যেন ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারছিনা । অদৃশ্য এক ভোরে আমার পা যেন ভেঙে যাচ্ছে । মাটি থেকে বা উঠানোর ক্ষমতায় যেন আমি হারিয়ে ফেলেছি । দৌড়াতে না পেরে এবার আমি রাম নাম মুখে নেওয়ার চেষ্টা করলাম । কিন্তু প্রচন্ড ভয়ের কারণে আমার গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বের হোলো না । তবুও আমি মনে মনে বলতে লাগলাম রাম রাম।

এই বেটা তুই এই পরা নাম মুখে আনিস না । বেচে থাকতে এই নামে মুখে নিয়েছি , আজও তর কোন লাভ হবে না । তর হাতের লাইটটা ফেলে দে , নইলে তর ঘারের রগটা এখনই টেনে ছিরে ফালবো। আত্তাতির এই কথা শুনে একটা জিনিস বুজতে পারলাম আমর সাথে লহের লাইটটি থাকায় আমর শরীরের উপর নিয়ন্ত্রন নিতে পারে নি। যার ফলে আমর কোন ক্ষতিও করতে পারে নি। তাই আমি সিধান্ত নিলাম যতকিছুই হয়ে যাক আমি হাত থেকে কিছুতেই লাইটটি ছারবো না । তখন আমি মনে কিছুটা সাহস পেলাম আর সেই সাথে জোরে জোরে রাম নাম নিতে লাগলাম। রাম রাম রাম রাম, সামান্য এই রাম নাকে তুই আমর কিছু করতে পারবি না । তর ঘাড় আজকে আমি মটকাবই , এই কথা শুনে আমর যেনো দম বন্ধ হয়ে আস্তে লাগলো।

ভয়ে সেই সময় আমর খুব কান্না পাচ্ছিল কি করব তখন তা বুঝতে পারছিলাম না । সেই আত্মাটি গাছ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলো মনে মনে ঠিক করলাম এখনি দৌড়াতে হবে । যখনি দৌড়াতে যাবো ঠিক তখনি আবের একি জাইগায় বৃদ্ধটিকে দেখতে পেলাম। এবার সে আমাকে বিশ্রী একটা নোংরা ভাষায় গালি দিয়ে বললো “ তোর ভাগ্য আজকে ভলো নাহলে আজকে তোকে কোন ভাবেই বাচতে দিতাম না “। এই কথা বলেই সে অদৃশ্য হয়ে গালো তৎক্ষণাৎ কিছুই বুঝতে পারলাম না । কেন সে আমাকে ছেরে দিলো , বুঝতে পারলাম ঠিক পাস থেকে দশ সেকেন্ড পর আমর পেছন থেকে শুনতে পেলাম ভাঙ্গা পুরনো সাইকেলের আওয়াজ। এবং বুঝতে পারলাম কেও একজন আমর এই দিকেই আসছে ।

আর সেই জন্যই হইত আত্মাটি আমাকে ছেড়ে দিয়েছে । সাইকেলটি কিছুটা কাছে আসতেই টর্চের আলোতে দেখলাম নিতাই কাকা। আমাদের বাসার পাশেই থাকেন, তিনি পেশায় একজন গ্রাম্য ডাক্তার । হয়তোবা কোন এক রোগীর বাড়ি থেকে নিজ বাসায় ফিরছিলেন। ভাগ্যিস সেই কারণে আজকে সেই দুষ্ট আত্মাটি থেকে রেহাই পেলাম ।

নিতাই কাকা” কি হে এখানে এত রাতে এমন করে দাড়িয়ে আছো কেন?” আমি নিতাই কাকার কথাতে কোন উত্তর না দিয়ে কান্না করতে লাগলাম । আর টর্চ লাইটে তাল গাছের মাথা নির্দেশ করলাম । ও বুঝতে পারেছি , নে সাইকেলে ওঠ । তোকে বাড়ি পৌছে দিচ্ছি আমি আর দেরি না করে দ্রুত সাইকেলে উঠে বসলাম। আর শেষে পৌছে গেলাম আমার বাড়িতে , এই বলে বাবা তার গল্পটি শেষ করলেন। বাবার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি শুনে আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম।

এই ঘটনাটি সম্পর্কে যদি আপনাদের কোন ধরনের প্রশ্ন বা পরামর্শ থেকে থাকে তাহলে নিচে কমেন্ট করে অবশ্যই জানিয়ে দেবেন ।

ধন্যবাদ।

Default image
shipon al hasan
Articles: 10

Leave a Reply